শেষ মেসেজ
রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা।
ঘরের সমস্ত আলো নিভিয়ে বিছানার এক কোণে বসে ছিল অর্ণব। জানালার বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির শব্দগুলো যেন আজ তাকে আরও বেশি একা করে দিচ্ছিল।
মোবাইলের স্ক্রিনে একটার পর একটা ছবি স্ক্রল করছিল সে।
ছবিগুলো সব একই মানুষের।
মেঘলা।
যে মেয়েটার সঙ্গে একদিন সারাজীবন একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল অর্ণব।
আজ সেই মেঘলার বিয়ে।
আগামীকাল সকালেই।
টেবিলের উপর পড়ে আছে লাল রঙের বিয়ের কার্ডটা।
তিনদিন আগে ডাকযোগে এসেছিল।
খামের ওপরে নিজের হাতের লেখায় অর্ণবের নাম দেখে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি।
কার্ড খুলে যখন পড়েছিল, তখন বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল।
"মেঘলা ও সৌরভের শুভ বিবাহ"
এই কয়েকটা শব্দ যেন সাত বছরের স্মৃতিকে এক মুহূর্তে শেষ করে দিয়েছিল।
অর্ণব কার্ডটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে ছিল।
কাঁদেনি।
কিছু মানুষ আছে যারা খুব বেশি কষ্ট পেলে আর কাঁদতে পারে না।
শুধু চুপ হয়ে যায়।
অর্ণবও তেমনই হয়ে গিয়েছিল।
---
সাত বছর আগে...
কলেজের প্রথম দিন।
নতুন ক্লাস, নতুন মুখ, নতুন পরিবেশ।
সেই প্রথম মেঘলাকে দেখেছিল অর্ণব।
সাদা সালোয়ার, নীল ওড়না আর চোখভরা অদ্ভুত এক সরলতা।
মেয়েটা হেসে বলেছিল,
"এই বেঞ্চটা খালি আছে?"
অর্ণব উত্তর দিতে গিয়ে অকারণেই নার্ভাস হয়ে পড়েছিল।
"হ্যাঁ... বসতে পারো।"
সেদিন থেকে শুরু।
তারপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব।
বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা।
ভালোবাসা থেকে অভ্যাস।
আর সেই অভ্যাসটাই একদিন অর্ণবের জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছিল।
---
মেঘলা প্রায়ই বলত,
"জানো অর্ণব, যদি কোনোদিন আমি হারিয়ে যাই, তুমি আমাকে খুঁজবে?"
অর্ণব হেসে বলত,
"তুমি হারাবে কেন?"
"তবুও বলো না।"
"পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত খুঁজব।"
মেঘলা তখন শিশুর মতো হেসে উঠত।
সেই হাসিটাই ছিল অর্ণবের পৃথিবী।
---
কলেজ শেষ হলো।
সবাই চাকরির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে গেল।
কিন্তু বাস্তব জীবন গল্পের মতো সহজ হয় না।
অর্ণবের বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ল তার কাঁধে।
চাকরির জন্য একটার পর একটা পরীক্ষা দিলেও সফল হচ্ছিল না।
অন্যদিকে মেঘলার বাড়িতে বিয়ের চাপ বাড়ছিল।
প্রথমদিকে মেঘলা লড়াই করেছিল।
অনেক লড়াই।
কিন্তু প্রতিদিনের পারিবারিক চাপ, আত্মীয়দের কথা, সমাজের বিচার...
সবকিছু ধীরে ধীরে তাকে ক্লান্ত করে তুলেছিল।
এক সন্ধ্যায় মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,
"আমি আর পারছি না অর্ণব।"
"আর একটু অপেক্ষা করো।"
"কতদিন?"
অর্ণব কোনো উত্তর দিতে পারেনি।
কারণ তার কাছেও উত্তর ছিল না।
---
সেদিনই প্রথম তাদের মধ্যে নীরবতা জন্ম নেয়।
আর অনেক সম্পর্ক শব্দে ভাঙে না।
নীরবতায় ভেঙে যায়।
---
তারপর একদিন মেঘলা ফোন করেছিল।
কণ্ঠটা অদ্ভুত শান্ত ছিল।
"বাড়ি থেকে একটা ছেলের সঙ্গে বিয়ের কথা বলছে।"
অর্ণবের বুক কেঁপে উঠেছিল।
"তুমি কী বলেছ?"
"এখনও কিছু বলিনি।"
"তাহলে না বলে দাও।"
ফোনের ওপারে কয়েক সেকেন্ড চুপ ছিল মেঘলা।
তারপর ধীরে বলেছিল,
"সব যুদ্ধ একা লড়া যায় না অর্ণব।"
এই কথাটার উত্তর অর্ণব আজও খুঁজে পায়নি।
---
সময়ের সঙ্গে কথা কমতে লাগল।
মেসেজ কমতে লাগল।
ফোন কমতে লাগল।
তারপর একদিন সব বন্ধ হয়ে গেল।
সম্পূর্ণ।
কোনো ঝগড়া নয়।
কোনো অভিযোগ নয়।
কোনো বিদায়ও নয়।
শুধু দূরত্ব।
---
বিয়ের কার্ড পাওয়ার পর তিনদিন ধরে অর্ণব ঠিকমতো ঘুমায়নি।
বারবার পুরনো চ্যাট খুলে দেখেছে।
পুরনো ছবি দেখেছে।
পুরনো ভয়েস মেসেজ শুনেছে।
কিছু স্মৃতি মানুষকে সুখ দেয়।
কিছু স্মৃতি ধীরে ধীরে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়।
---
রাত একটা বেজে গেল।
মোবাইলটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
WhatsApp Notification।
অর্ণব প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি।
তারপর নামটা দেখে বুকের ভেতরটা থেমে গেল।
"Meghla"
সাত মাস পর।
মেঘলার মেসেজ।
হাত কাঁপতে কাঁপতে চ্যাট খুলল সে।
মেসেজে মাত্র একটি লাইন লেখা ছিল।
"তুমি কি এখনও জেগে আছো?"
অর্ণবের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
যে মানুষটার জন্য এতদিন অপেক্ষা করেছিল, সেই মানুষটাই বিয়ের আগের রাতে ফিরে এসেছে।
কিন্তু কেন?
কী বলতে চায় মেঘলা?

0 Comments
Thank you so much for commenting , we hope you don't face any problem . Please subscribe 🙏 ....... If you are interested to write your story or poems , please email us